يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ (10) تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (11) يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (12) وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ

অর্থাৎ হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার কথা বলব যা তোমাদেরকে পীড়াদায়ক আযাব হতে রক্ষা করবে? তোমরা ঈমান আন আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের ধনসম্পদ এবং জীবন দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম; যদি তোমরা বুঝ। তিনি তোমাদের গুনাহ-খাতা মাপ করে দিবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত এবং বসবাসের জন্য অতীব উত্তম বাসস্থান দান করবেন চিরস্থায়ী জান্নাতে, এটাই বিরাট সাফল্য। এবং আরো একটি অনুগ্রহ দিবেন, যা তোমরা পছন্দ কর; আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং নিকটবর্তী বিজয়। (হে রাসুল) মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ জানিয়ে দিন। (সুরা সফ ১০-১৩)


নামকরণঃ

সুরার ৪র্থ আয়াতের বাক্যাংশ “সফ” বা “কাতার বন্দী” শব্দটিকে এর নাম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তারাই যারা তার পথে “কাতার বন্দী” হয়ে সীসাঢালা প্রাচীরের মত লড়াই করে।
শানে নযূলঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম হতে বর্ণিত একদা একদল সাহাবায়ে কেরাম পরস্পরে আলোচনা করলেন যে, আল্লাহ তায়ালার কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি আমরা যদি তা জানতে পারতাম তাহলে তার আমল করতাম। তারা এব্যাপারে নবী করীম (সঃ) কে প্রশ্ন করার জন্য কাউকে পাঠাতে চাচ্ছিলেন কিন্তু কারো সাহস হচ্ছিল না। ইতিমধ্যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে নামে নামে নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন। তারা তাঁর কিনট উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে সমগ্র সুরা সফ পাঠ করে শুনালেন যা তখনই নাযিল হয়েছিল। (আহমাদ, ইবনে কাসীর)
আলোচ্য বিষয়ঃ এ সুরায় কথা ও কাজের মধ্যে বৈপরিত্য বা মুনাফেকী সম্পর্কে কঠোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এধরনের কাজ আল্লাহর নিকট খুবই গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। পক্ষান্তরে সব চেয়ে পছন্দনীয় কাজ হল আল্লাহর পথে জিহাদ করা তা ও সুরায় আলোচনা করা হয়েছে। মুসলমানদেকে আহলে কিতাব তথা ইহুদী খৃষ্টানদের আচরণের কথা উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে যেন তিারা এ ধরনের আচরণ না করে। কাফের মুশরিকরা চায় আল্লাহর দ্বীনকে ধ্বংস করতে পক্ষান্তরে আল্লাহ তার দ্বীনকে বিজয়ী করবেনই বলে দ্বীপ্ত ঘোষণা দান করেছেন এবং মুসলমানদেরকে তার দ্বীনের পথে জিহাদ করার জন্য তারগীব করেছেন এবং এর সোয়াব বর্ণনা করেছেন আর আল্লাহর সাহায্যকারী হওয়ার জন্য উব্দুদ্ধ করেছেন। এ বিষয়গুলিকে সাবলীল ভাষায় এ সুরায় আলোচনা করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা ও আনুষঙ্গিক আলোচনাঃ
আমাদের দরসের আয়াতগুলিতে আল্লাহর পথে জিহাদের ফজিলত এবং তার উপায় উপকরণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে “তোমাদেরকে কি এমন একিট ব্যবসার কথা বলে দিব না- সন্ধান দিব না যা তোমাদেরকে পীড়াদায়ক আযাব হতে পরিত্রান দিবে?” এখানে জিহাদকে ব্যবসা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসার সাথে তুলনা করা হয়েছে। ব্যবসা করতে যেমন মুলধন লাগে, শ্রম লাগে, লোকবল লাগে তেমনি জিহাদেও এসবের প্রয়োজন পড়ে, মুখের কথায় জেহাদ হয়না। ব্যবসায়ে যেমন রয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি তেমনি জিহাদে রয়েছে পরকালীন মুক্তি ও পরিত্রাণ। দুনিয়াতে মানুষ কত ভাবে জীবিকা নির্বাহ করে কেউ চাকুরীবাকুরী করে কেউ ব্যবসাবানিজ্য করে কিন্তু জীবিকার শতকরা ৯০ ভাগ রয়েছে ব্যবসাতে।” দুনিয়ার রুজির বিভিন্ন পথের সম্বলের মাঝে সর্বোত্তম সম্বল ও বেশী লাভজনক হল ব্যবসা তেমনি পরকালীন সম্বল লাভের সবচেয়ে লাভজনক ও পূণ্যময় কাজ হলো আল্লাহর পথে জিহাদ। হযরত আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন “আমি বললাম হে আল্লাহর রাসুল! সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন “আল্লাহর উপর ঈমান আনা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (বুখারী, মুসলিম)
রাসুল কারীম (সঃ) ইরশাদ করেনঃ আল্লাহর পথে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা অতিবাহীত করা দুনিয়া ও তার মাঝে যা কিছু রয়েছে তা হতে উত্তম। (বুখারী মুসলিম)
হযরত ফুজালা বনি উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করেন প্রত্যেক মৃতের আমল বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু আল্লাহর পথে প্রহরাকারী। তার আমলকে কিয়ামত পর্যন্ত বাড়ন ও বৃদ্ধি করা হবে এবং কবরের ফিতনা হতে নিরাপদ রাখা হবে। (আবু দাউদ, তিরমিজী)
“তোমরা আল্লাহ এবং তার রসুলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবে তোমাদের মাল এবং জান দ্বারা।” অর্থাৎ ব্যবসার যে কথা বলা হয়েছিল তা হল ঈমান এবং জিহাদ। ঈমান বিহীন জিহাদ কবুল হবে না। কোন অমুসলিম যদি ইসলামের জিহাদে অংশগ্রহণ করে তাহলে এ জিহাদ তাকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না। তেমনি ভাবে মুনাফেকের জিহাদও কবুল হবে না। মুনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলুল এবং আরো অনেক মুনাফেক নবী করীম (সঃ) এর সাথে তাবুক সহ বহু জিহাদে অংশ গ্রহণ করে কিন্তু তাদের জিহাদ কোন কাজে আসেনি। তারা হবে জাহান্নামের অধিবাসী।
“জিহাদ করবে মাল এবং জান দিয়ে।” এখানে মালের কথা প্রথমে এজন্য বলা হয়েছে যে, মাল ছাড়া জেহাদ হয়না, জানের প্রয়োজন পড়তে পারে আল্লাহর ইচ্ছা হলে জানের প্রয়োজন নাও পড়তে পারে কিন্তু মাল সেতো সর্বাবস্থায় প্রয়োজন। জিহাদে জানের চেয়ে বেশী প্রয়োজন মালের। “এটাই তোমাদের জন্য উত্তম; যদি তোমরা বুঝ।” অর্থাৎ জিহাদ হচ্ছে উত্তম তোমাদের জান ও মাল হতে। কেননা এতে রয়েছে অগণিত কল্যাণ ও সোয়াব, ইহকালে ও পরকালের কল্যাণ ও মুক্তি যদি তোমরা এর মর্মকথা বুঝতে পার, এর কল্যান উপলদ্ধি কর।
“তোমাদের গুনাহ খাতা মাফ করে দিবেন।” এখান থেকে জিহাদের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা আরো যা কিছু দান করবেন তার উল্লেখ করা হয়েছেঃ
(১) গুনাহ খাতা মাফ করে দিবেন, ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিবেন।
(২) জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত আর সে জান্নাত এমন যা চিরস্থায়ী আবাসস্থল। এখানে লক্ষণীয় যে, “জান্নাতে প্রবেশ করাবেন” অর্থাৎ জিহাদ করলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর দায়িত্ব। তিনি জিহাদকারীকে অবশ্যই জান্নাতে দাখিল করবে।
(৩) আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য আসবে। আল্লাহ তায়ালা তার পক্ষথেকে মুজাহিদদেরকে জিহাদে সাহায্য করবেন। রসুলুল্লাহ (সঃ) থেকে শুরু করে অদ্যাবধি আল্লাহ তায়ালা জিহাদে সাহায্য করেছেন যা হাদীস কোরআন এবং ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। বর্তমান যুগে বসনিয়া ও আফগানের জিহাদ চাক্ষুস প্রমান।
(৪) নিকট বিজয় অর্থাৎ জিহাদে রত থাকলে আল্লাহ তায়ালা অচিরেই বিজয় দান করবেন। ইসলামের বিজয় পতাকা উড়বে।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, পরকালের অনুদান ও নিয়ামত গুলিকে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে আর দুনিয়ার নেয়ামত ও অনুদানকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে কেননা পরকালীন নিয়ামতই চিরস্থায়ী। পরকালীন সাফল্যই মুমিনের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষনীয়ঃ
জিহাদ হচ্ছে সর্বোত্তম তেজারত যা হবে সরাসরি আল্লাহর সাথে। এর লাভ খুবই আকর্ষণীয়।
ঈমান বিহীন জিহাদ মুল্যহীন। কাফের বা মুনাফেকের জিহাদ কোন উপকারে আসবে না।
জিহাদ করতে হবে মাল ও জান দিয়ে। জিহাদে মালের প্রয়োজনই সব চেয়ে বেশী। (তাই এর কথাই আগে উল্লেখ করা হয়েছে।)
জিহাদের প্রতিদান দেয়া হবে দুনিয়া ও আখেরাতে। দুনিয়ায় আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং পরকালে জাহান্নাম হতে মুক্তি এবং গুনাহ মাফ হয়ে চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ।