وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে উহাই চূড়ান্ত, সে বিষয়ে কোন মুমিন নর নারীর ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার নেই। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সেত স্পষ্ট্যই পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ। (সূরা-আহযাব-৩৬)

Translation: And it is not right for a believing man or a believing woman, when Allah and his messenger have decided an affair for them, that they should claim any say in their affair . It any one disobeys Allah and his messenger, he is indeed or a clearly wrong path

পটভূমি:
নামকরণ: এ সূরার নাম ‘আহযাব’ অর্থ মহাজোট। ৫ম হি: সনে নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্র রাসুল (স:)এর নেতৃত্বে যা মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উহাকে সমুলে উৎখাত করার জন্য মক্কার কোরাইশ, ইয়াহুদা বনি নজির-যাদেরকে প্রতারণার জন্য মদীনা হতে বের করে দেয়া হয়েছিল, এ ছাড়াও গাতফান, হুজাইল ও আরব বেদুইন ও মদীনায় চুক্তিবদ্ধ বনি কুরায়যা সকলে মিলে এক মহাজোট গঠন করে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে প্রায় ১৫,০০০ সৈন্য মদীনা আক্রমনের জন্য রওয়ানা হয়। মদীনার মোট জনসংখ্যা ও এর চেয়ে অনেক কম। রাসুল (স:) এ ভয়াবহ সংবাদ জেনে জরুরী দায়িত্বশীলদের নিয়ে বসেন। সম্মুখ সমরে তাদেরকে বাধা দেয়া একরকম অসম্ভব ছিল। হযরত সালমান ফারসী (র:) এর পরামর্শে মদীনার উত্তর পশ্চিমে ১০ দিনে পরিখা খনন করে বাধার সৃষ্টি করেন। যেহেতু দক্ষিন দিকে বিপুল খেজুরের বাগানের বাধা ছিল রসুল (স:) নিজেই নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ৩,০০০ এক জীবন উৎসর্গকারী বাহিনীর । সময়টি ছিল কঠিন শীতের এক মাসের মত যুদ্ধ অব্যাহত। এত বড় সৈন্যবাহিনীর খাদ্য পানীয়, রসদ সরবরাহ কাফেরদের জন্যে একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারা যুদ্ধ এতদিন চলবে ধারণা করেনি। এ অবস্থায় এক রাতে প্রচন্ড ঝড় শুরু হলো, যা তাদের তাঁবু শুধু উড়িয়ে নেয়নি বরং আগুন জালানো, রান্নার ব্যাবস্থা করা দুরুহ হয়ে পড়ায় তারা রনে ভংগ দিল, রাতের মধ্যে বিশৃংখল ভাবে পালাতে শুরু করে। এমনকি বনি কোরায়জা রাসুল (সঃ) এর সাথে যারা চুক্তি বদ্ধ হয়েও মহাজোটের সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখত তাদেরকেও না জানিয়ে আবু সুফিয়ানের বাহিনী রাতেই পালাল। অথচ এরা মনে করছে যে আক্রমন কারীরা এখনও পালায়নি। (আহযাব-২০)
يَحْسَبُونَ الأَحْزَابَ لَمْ يَذْهَبُوا
“ এরা মনে করে যে আক্রমনকারী মহাজোটের বাহিনী এখনও চলে যায়নি” এ আয়াতের ‘আহযাব’ থেকে এ সূরার নামকরণ হয়েছে। এ একটি শব্দ গোটা যুদ্ধের দৃশ্যপট সামনে নিয়ে আসে। তাই এ প্রতীকি শব্দ ‘আহযাব’ মহাজোট থেকে এ সূরার নামকরণ।
রর. : নাযিলের সময় ও ঐতিহাসিক পট: এ সুরায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা হয়েছে।
১. আহযাবের ভয়াবহ আক্রমন ও আল্লাহর সাহায্য।
২. বনি কোরায়যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
৩. রসুলের সাথে হযরত যয়নব বিনতে যাহশ্রে বিয়ে যা এতই তাৎপয্যপূর্ণ যে আল্লাহ তায়াল অহির মাধ্যমে এ বিষয়ে রাসুলের উপর কার্যকর করেন।
এসব সংগঠিত হয়েছিল ৫ম হিজরী সনে। সুতরাং এ সূরার নাযিল হওয়ার সময়কাল নিয়ে আর মতদ্বৈতার আর সুযোগ নেই।

তাফসীর:
It is not fitting for a believer, man or woman when a matter has been decided by Allah and his messenger
“ কোন বিষয়ে যখন আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসে মুমিনদের জন্যে উহাই চুড়ান্ত। মানব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহনের পূর্বে প্রয়োজন হিদায়ত বা সঠিক পথনির্দেশ এ হিদায়ত ও পথনির্দেশ মানুষেরা কিভাবে লাভ করবে? -মানুষেরা যদি নিজেদের মন ও ইচ্ছাকে এর উৎস বানায় ঠিক হবে। মানুষ কি পূর্বথেকে চলে আসা বাপ-দাদাদের রীতিকে হেদায়ত বানাবে। না, বেশির ভাগ মানুষদের মতামতকে আইনের উৎস বানাবে? এগুলো কোনটাই আল্লাহর নিকট হেদায়ত ও চূড়ান্ত চলার guide নয়। আদম (আ:) কে পৃথিবীতে পাঠাবার পর আল্লাহর পক্ষ হতে জানিয়ে দেয়া হয়। জীবন পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর অহিকে একমাত্র পথ নির্দেশ হিসেবে মেনে নিতে হবে প্রতিটি বিষয়ে। কোরআন বলছে , فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ
“আমার পক্ষ হতে তোমাদের জন্য জবিন চলার বিধান তথা হিদায়ত অবতীর্ন হবে যারা এর অনুসরন করে চলবে তাদের জন্য দু:খের ও ভয়ের কোন কারন থাকবেনা” (বাকারা-৩৮)
এ বিষয়ে মনে রাখতে হবে, নবী-রাসুলগন যাদের উপর আল্লাহর অহি অবতীর্ণ হয়েছে। যাদের জীবন অহির নূরে পূর্ণভাবে আলোকিত তাদের জীবনও মানুষের জন্য Practical হেদায়াত। এঁদের সব শেষ, মুহাম্মদ (স:) আগমনের পর তার আনিত কিতাব আলকোরআনন ও তাঁর পবিত্র জীবন আদর্শই পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্ব নর-নারীর চূড়ান্ত ও একমাত্র হেদায়তের উৎস। কোরানই নবীয়েকারিম এ সম্পর্কে কোরন বলছে,
وَمَا آتَاكُمْ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
“মুহাম্মদ (স:) তোমাদের জন্য যে ফায়সালা এনেছেন উহা বিনাবাক্যে গ্রহণ কর যা থেকে নিষেধ করেন উহা হতে বিরত থাক”( হাশর-০৭)
যারা বিশ্বাস করেছে-‘আল্লাহ তায়ালাকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে আর বিশ্বাস করেছে মুহাম্মদ (স:) কে আখেরী রাসুল হিসেবে তারা এ ঘোষণা দিয়েছে আল্লাহ ছাড়া আইনের আর কোন উৎস নেই হতে পারেনা তিনি তাঁর জাত ও গুনাবলিতে সম্পূর্ন লা-শরিক। সৃষ্টির উপর তার একমাত্র বিধান চলবে, সকল নবীগন মানব কুলের নিকট এ পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন। أَلا لَهُ الْخَلْقُ وَالأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
“সাবধান, সৃস্টি যার আইন চলবে তার, মহান আল্লাহই বিশ্বজগতে প্রভু” । (আরাফ-৫৪ )
وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
“তিনি আল্লাহর মনোনিত রাসুল-তিনি যা কিছু বলেন ও করেন সব অহির অন্তর্ভূক্ত আল্লাহরই প্রত্যাদেশ”।
( আহযাব -৪০)
কোরান বলছে- وَمَا يَنْطِقُ عَنْ الْهَوَى- إِنْ هُوَ إِلاَّ وَحْيٌ يُوحَى
“তিনি মুহাম্মদ যিনি নিজ থেকে কিছু বলেন না যা বলেন উহা অহি যা তার উপর আল্লাহ হতে অবতীর্ন”
( সুরা নাজম ৩-৪)
কোরান আরো বলছে, “তিনি শ্রেষ্ট নবী মুহাম্মদ (স:) এর মাধ্যমে নবুয়ত সমাপ্ত করা হয়েছে। তার আগমনের মাধ্যমে সকল নবীদের নবুয়তের কার্যকারিতা রহিত করা হয়েছে। পৃথিবীর প্রলয়দিন অবধি একমাত্র মুহাম্মদ (স:) এর লাশারিক নবুয়ত চলবে, ইহাই-তার নবুয়তের অন্যন্য বৈশিষ্ট। সকল পূর্বের কিতাব ও আগের নবীদের নবুয়ত মানসুখ করা হয়েছে। সকল নরনারী যারা আছে ও আসবে, অন্য কোন গ্রহেও যদি মানুষ থাকে সকল কে আখেরী রাসূল মুহাম্মদ (স:) ও সর্বশেষ আসমানী কিতাব-কোরানুল করিমকে হিদায়তের মূল উৎস হিসেবে গ্রহন করা ব্যতিরেকে আর কোন পথ খোলা নেই”।
( আহযাব-৩৬)
أَنْ يَكُونَ لَهُمْ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
“It is not for a believing man or a believing woman prophet’s decision”
“কোন ঈমানদার-নর নারীর জন্য আল্লাহ ও রাসুলের সিদ্ধান্ত আসার পর বিষয়ে নিজেদের ব্যাক্তিগত ভাবে কোন ফয়সালা গ্রহনের কোন ইখতিয়ার নেই” (আহযাব-৩৬)
They have no tught it claim any say, or to deny anything against Allah and his prophet’s order.
“বান্দাদের উচিত নিজের পছন্দ অপছন্দের চেয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্ত সর্বোতভাবে মেনে নেয়া। তারাইত বন্দেগীর সীমার মধ্যে রয়েছে, যারা তাদের আজাদীকে মনিবের নিকট, তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করেছে। এ ক্ষেত্রে সামান্যতম বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই। কোরান বলছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“হে মুমিনগন! আল্লাহ ও তার রাসুলের সামনে কোন বিষয়ে অগ্রগামী হবেনা, আল্লাহকে ভয় কর, তিনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। ( হুজরাত-০১)
জীবন চলার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে কোরান ও সুন্নাহর বাইরে একটি কদম দেয়ার অধিকার মুমিনদের জন্য স্বীকৃত নয়। কোরানুল করিমে সতর্ক করা হয়েছে, আল্লাহর রাসুলের সামনে তার আওয়াজের উপর উচ্চস্বরে কথা বলা ও হারাম। এরুপ করলে সমগ্র জীবনের সকল গৃহিত নেক আমলও ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ ও রাসুলের উপর ঈমান আনবে আর জীবন পরিচালিত হবে নিজের ইচ্ছায় তবে এ ঈমানের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। এ বিষয়ে রাসুলের ও সাহাবীগন পরবর্তিদের জন্য আদর্শ। সাহাবীগণ দ্বীনের বিষয়ে নিজেদের মতামত, সমাজ ও সভ্যতার চলমান রীতিনীত, জানমালের ক্ষতি, লাভ লোকসান কোন কিছুকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর প্রধান্য দেয়নি। বদরের যুদ্ধের প্রাক্কালে পরামর্শ সভায় আনসার ও মুহাজির নেতৃবৃন্দের বক্তব্য প্রণীধান যোগ্য। মুহাজির নেতা মিকদাহ ইবনে আমর (র:) বলেছিলেন, হে রাসুল আপনি যদি যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন তবে আমরা আপনাকে মুছার জাতীর মত বলবনা। তুমি, তোমার খোদাকে নিয়ে যুদ্ধে যাও আমরা এখানে বসে রইলাম, বরং আমরা আপনার ডানে, বাঁয়ে সামনে ও পিছনের থেকে যুদ্ধ করতে থাকব”- বুখারী
অপর দিকে আনসারদের পক্ষে সাদ ইবনে মা’য(র:) বলেন, “হে আল্লাহর রাসুল(স:) পরামর্শ শেষ হয়েছে আপনি সিদ্ধান্ত দিন আপনার নির্দেশ আমরা সাগরে ঝাঁপ দিতে থাকব একজন ও বাকী থাকবেনা, জীবন মৃত্যুর কোন পরওয়া করবনা।” তাদের বক্তব্য শুনে রাসুলের চেহারায় হাঁসি ফুটে উঠে। (মুসলিম)
সুপ্রিয় পাঠক! রাসুলের ইত্তেবার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্যও আছে। সাহাবীগন রাসুলের আনুগত্যের কি জলন্ত নমুনা সকল যুগের মানুষদের সামনে রেখেছে উপরের হাদীস দুটি কঠিন দালীল। আজকের সময়ের কঠিন মুহুর্তে দ্বীন ও কুফরীর সংঘাত থেকে পাশ কাটিয়ে চলার হাজার খোঁড়া যুক্তি, জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে অন্যকিছু দ্বীনের আচার অনুষ্ঠানকে প্রাধাণ্য দেয়া সরাসরি রাসুলের নির্দেশের স্পষ্ট্য লংঘন ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ, আমাদেরকে আল্লাহ ও রাসুলের সরাসরি হুকুম পালনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়িয়ে, পাশ কাটিয়ে মুনাফিকদের পথ পরিহার করে সাহবীদের পদাংক অনুসরন করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও বিষয়টি একেবারে সহজ নয় এ পথে রয়েছে বাধার পাহাড়, জীবনের উপর রয়েছে অবর্ণনীয় জুলুম এর ঝুঁকি, জেল, সেল ও ফাঁসির রজ্জু। ঈমানের উপর অটল বিশ্বাস ও সত্যের উপর দাঁড়াবার কঠিন শপথ ও হকের জন্য সবকিছুকে কুরবানীর অদম্য মনোবল নিয়ে মুমিনরা এ পথে এগিয়ে যাবে সাহাবীদের রেখে যাওয়া পদ চিহ্ন ধরে।
নফসের হুকুক পালন ও পরিস্থিতির দোহাই প্রদান কারীদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি-ঈমানের পথে নফস পুরুস্তি, সমাজের দাসত্ব, সংখ্যাধিক্যের মাসয়ালা বিষয় একক ও চূড়ান্ত। (আহযাব-৩৬)
وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالاً مُبِيناً
“ It any one disobeys Allah and its messenger, he is indeed on a clearly wrong Path”
“ যে কেউ আল্লাহ ও তার রাসুলকে অমান্য করল সে স্পষ্ট্য গোমরাহ” আয়াতের এ অংশে উপসংহার টানা হচ্ছে। প্রথমে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য আলোচনার পর বলা হয়েছে আনুগত্য ছেড়ে অমান্য করার পরিনতি হবে জাহান্নাম যা হবে গোমরাহির শেষ পরিনতি। বিশুদ্ধ সনদে হাদিস -
হযরত জাবির (র:) হতে বর্ণিত নবীজি (স) বলেন, “সর্বোৎকৃষ্ট কালাম-কালামুল্লাহ শরীফ, সর্বশ্রেষ্ট পথ-প্রদর্শক মুহাম্মদুর রাসুল্লাহ, সবচেয়ে নিকৃষ্ট পন্থা-বিদায়াত, প্রতিটি বিদায়তই গোমরাহি আর উহার পরিনতি জাহান্নাম”।
(বুখারী মুসলীমও নাসাঈ)
রাসুলের (স:) এর বিরুদ্বাচরণ হারাম। কোরান বলেছে যারা রাসুলের হাতে শপথ করেছে তারা বরং আল্লাহর হাতে শপথ করেছে যেন।
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ
“হে নবী, যারা তোমার হাতে বায়াত করে, তারাতো আল্লাহর হাতেই বায়াত করে আল্লাহ তায়ালার হাত তাদের হাতের উপর ”। (সুরা ফাতহি -১০)
আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসুলের উপর ঈমানের দাবী হচ্ছে-শর্তহীন, পুর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণভাবে সর্বাবস্থায় ও সকল সময়ে আনুগত্য ও অনুসরন। আর এর বিরোধীতার পরিনাম সম্পর্কে কোরান ও হাদীসে উক্ত হয়েছে সতর্কবানী এবং আনুগত্য কারীদের জন্য রয়েছে শুভ সংবাদ।
فَمَنْ نَكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْراً عَظِيماً
‘যারা আনুগত্যের বায়াত ভঙ্গ করল, উহার পরিনাম তাদের নিজেদের উপর বর্তাবে এবং যে অঙ্গিকার পূর্ণ করে আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে রয়েছে মহান পুরস্কার”। ( সূরা ফাতহি-১০)
বিষয়টি এতই তাৎপর্যপূর্ণ যে কোরান হাদীসের অসংখ্য বর্ণনা এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা না বাড়িয়ে আমি আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা শেষ করতে চাই।
শিক্ষাসমুহ:
আলোচিত আয়াতের শিক্ষা সংক্ষিপ্ত ও যথার্থ
১. সিদ্ধান্ত ও ফায়সালা-জীবনের সকল বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুল মুহাম্মদ (সঃ) থেকে আসবে।
২. মুমিন নর-নারীগনকে সকল বিষয়ে ও সর্বাবস্থায় এ ফয়সালা পরিপূর্ণ মেনে নেয়া ঈমানের দাবী
৩. মুমিনদেরকে আল্লাহ ও রাসুল (স:) যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সে বিষয়ে নিজেদের পক্ষ হতে আর কোন নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ইখতেয়ার নাই ও রহিল না।
৪. যে কেউ খোদায়ী সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করবে সে নি:সন্দেহে গোমরাহিতে নিপতিত হবে।
৫. সমস্ত গোমরাহির পরিনাম-জাহান্নাম।
৬. মুমিনদের অবশ্যই জেনে নিতে হবে জীবনাচরণের প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ কি আদেশ দিয়েছেন আর রাসুল (স:) উহা পালনের কি বাস্তব আদর্শ রেখে গেছেন।
উপসংহার:
মানবতার হিদায়তের বিষয় আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে আদম (আ:) আগমনের সাথে অবতীর্ণ হয় হিদায়তের বিধিবিধান, যদিও মানুষেরা এ বিধানকে অমান্য করে অসংখ্য অইন ও কানুন বানিয়েছে এর কোন মাথা পরিসীমা নেই। দুটি বিন্দুর মধ্যে অসংখ্য রেখা টানা যাবে কিন্তু সরল রেখা শুধু একটিই টানা সম্ভব। বান্দাদেরকে যদি B একটি বিন্দু ধরে নেই। তবে B কে A বিন্দু পর্যন্ত পৌছাতে অগনিত রেখা টানা গেলেও সবগুলো বক্র রেখা। কোন বক্ররেখা B থেকে A বিন্দুতে পৌঁছাতে পারবে না. ইহা জ্যামিতিক ভাবে প্রমানিত। আর ইহাও প্রমাণিত যে B বিন্দু হতে A বিন্দু পর্যন্ত যে রেখাটি পৌঁছাতে সক্ষম উহাই সরল রেখা তথা সিরাতে মুস্তাকিম। ইহাও সত্য যে সরল শুধু একটি টানা যাবে আর উহা সব বক্ররেখার চেয়ে ছোট। মানুষের এ অসংখ্য ও অগনিত বক্র পথ বা রেখা হতে সরল রেখাটি পৃথক করে নিতে পারবেনা ইহা অসম্ভব ও দুরুহ বিষয়। তাই আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে নবীদের মাধ্যমে সকল যুগে মুক্তির সরল পথটি অহির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। মানুষের উচিত নিজ জ্ঞানের উপর বিশ্বাস না করে পৃথিবীর তাব্য মানুষের কাছ থেকে আগত দেখানো পথকে পরিহার করে অহি প্রদর্শিত সিরাতে মুস্তাকীমকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। এ বিষয়ে কুরান স্পষ্ট্য করে বলে
وَعَلَى اللَّهِ قَصْدُ السَّبِيلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ
“সঠিক ও সরল পথ-প্রদর্শন শুধু আল্লাহ তায়ালার হাতে যেখানে রয়েছে অসংখ্য বক্র পথ”। (সূরা নাহল-০৯)
আল্লাহ তায়লা নিজ দায়িত্বে ও কুদরাতি ব্যবস্থাপনায়-হিদায়তের মূল দুটি বস্তুকে
এক: আখেরী কিতাবকে এর প্রতিটি বর্ণ নাযিলের পর হতে অদ্যাবধি রয়েছে অবিকৃত. অক্ষয় চিন্ময় ও ভাস্কর যার মধ্যে নেই ভুলের কোন অস্তিত্ব। ذَلِكَ الْكِتَابُ لا رَيْبَ فِيهِ আর কোন আসমানী কিতাবকে এ বিশেষণে বিশেষিত করা যাবেনা, হোক, তাওরাত, যবুর বা ইঞ্জিল-যার মধ্যে ভুলের অস্তিত্ব নেই? মানুষেরা কি জানেনা, আল কেরাআন ছাড়া পূর্বের নাযিল কৃত কোন কিতাবের কোন মূল কপি কি আসমানের নিচে কোথায়ও আছে? যেগুলো আছে সে গুলো মানুষের রচিত ও অনুদিত এর মধ্যে কিছু বাক্য হয়তো পাওয়া যাবে সঠিক তাত্ত আবার অনুবাদ মাত্র। ঐ সমস্ত কিতাবের কোন হাফিজ ও কোন যুতো ছিল কিনা তাও কারো জানা নেই। আল্লাহ তায়ালা সেগুলোকে সকল যুগের হেদায়াতের জন্য নাযিল করেন নি। সেগুলো ছিল বিশেষ যুগের ও বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্যে। সে যুগ ও সে সম্প্রদায় আর নেই। তাদের জন্যে অবতীর্ণ সে বিশেষ হেদায়ত গ্রন্থ ও সংরক্ষনের আর প্রয়োজন নেই। একমাত্র মহাগ্রন্থ হিদায়তের সর্বশেষ কিতাব আল কোরআনকে আল্লাহ সকল মানুষের জন্য ও সর্বযুগের প্রয়োজনে নাযিল করেছেন। তাই এ কিতাব বেঁচে থাকবে কাল থেকে কালান্তরে। একে মুছে দিতে কেউ চাইলে সেটি অসম্ভব হবে। কারন এর দায়িত্ব নিয়েছে রাব্বুল আলামীন। তিনি ইহাকে সংরক্ষন করবেন পৃথিবী প্রলয়েরও পরে।
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“আমি এ যিকর নাযিল করেছি আর নিজেই এর হিফাজত কারী”। (হিযর-০৯)
আর দ্বিতীয়টি: মুহাম্মদ (স:) এর নবুয়তী জীবন ও আদর্শ তাঁকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ মানব গোষ্ঠি বা বিশেষ ভুখন্ডের জন্যে পাঠাননি। তার নবুয়তের কোন চিহ্নিত সীমানা নেই।
সকল নাবীরা এসেছিলেন নির্দিষ্ট জমিনে, ও বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্যে, সকলে ছিলেন এলাকার নবী আর মুহাম্মদ (স:) ছিলেন আলামীন তথা বিশ্বনবী।
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعاً
“বলুন হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমদের সকলের জন্যে রাসুল হয়ে এসেছি”। (আরাফ -১৫৮)
অসংখ্য নবী রাসুল পৃথিবীতে এসেছেন কোরানে এদের মধ্যে মাত্র ২৮ জনের মত নাম উল্লেখ হয়েছে, বাকি লাখ পয়গম্বরের নামও পৃথিবী-জানেনা। যে সমস্ত উলুল আসম নবীদের নাম উল্লেখ হয়েছে তাদের মধ্যে একজনও এমন নেই। যার পূর্নাঙ্গ জীবনত দুরের কথা খন্ডিত জীবন ও নবীদের মুখ নি:সৃত হাদীস সঠিক বলে ইতিহাসের মানদন্ডে উৎরে যেতে পারে। সুবহানাল্লাহ! মুহাম্মদ (স:) নবুয়তী জীবন ও তার লাখলাখ হাদীস ইতিহাসের কঠিন যাচাইয়ের পর বুখারী- মুসলিমের মত বিশুদ্ধতম হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে ও থাকবে কালের ধ্বংসকে পদালিত করে। উহা শুধু আছে তাই নয়, লাখো হাদীস সিনায় ধারণ করে রয়েছেন এমন হাফেজুল হাদীস এর সংখ্যাত হাজার হাজার। আবার নবীজির প্রতিটি হাদীস কোটি কোটি মোমিনের জীবন চরনে জীবন্ত হয়ে রয়েছে ও থাকবে অনাগত কাল পর্যন্ত।
ধন্য উম্মুতে মুহাম্মদী (স:) যাদের নিকট শুধু রয়েছে হিদায়তের অম্লান কিতাব ও হায়াতুন্নবীর (স:) চিরঞ্জীব আদর্শ। তারা শুধু নিজেদের জীবনে উহাকে গ্রহণ করবে ও জান্নাতের পথে এগিয়ে যাবে এতটুকু যথেষ্ট নয়। বরং দিশাহারা, বিভ্রান্ত ও আধুনিক জ্যাহেীলয়াতের অতলে নিমজ্জিত মানবতাকে দেখাতে হবে হেদায়তের শেষ পথ। এপথের দাবী ‘সাহস’ শত্রুরা মারণাস্ত্র নিয়ে পথ রুদ্ধ করবে তাদের ভয়াল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে। অপ্রস্তুত অবস্থায় সংঘাতের যাওয়া কোরান বৈধ করেনি। হাতিয়ার,হিকমাহ ছাড়া যারা সামনে যেতে চাইবে তারা নিজেদের ও মিল্লাতের ক্ষতিই শুধু বাড়াব্ েআর প্রয়োজন সীমাহীন ছবর সর্বাবস্থায় ধৈর্য্যকে পূঁজি করে এ পথে আগাতে হবে। আর যে কোন মূল্যে শৃংখলার মধ্যে থাকতে হবে উশৃংখল জনগোষ্ঠি দ্বীনের শত্রু। এদের আর শেষ রাতের আহাজারী ও চোখের পানি দিয়ে আল্লাহর সাহায্যকে অনিবার্য্য করে তুলতে হবে। আল্লাহ তায়ালা দায়ীদের সাহয্যকে অনিবার্য্য করে তুলতে হবে। আল্লাহ তায়ালা দায়ীদের ঢেলে দেয়া শহীদি খুন ও চোখের পানি বৃথা যেতে দিওনা।

আমীন।