এ.কে.এম. নাজির আহমদ

ياَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ০ قُمْ فَاَنْذِرْ ০ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ০ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ০ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ ০ وَلاَ تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ ০ وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ ০

‘ওহে আবৃত ব্যক্তি, উঠ এবং (লোকদেরকে) সাবধান কর। এবং তোমার রবের বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর, প্রতিষ্ঠা কর। এবং তোমার পোশাক পবিত্র পরিচ্ছন্ন রাখ। এবং যাবতীয় মলিনতা থেকে দূরে থাক। এবং বেশি পাবে আশায় অনুগ্রহ করো না। এবং তোমার রবের খাতিরে ছবর অবলম্বন কর।’

৩। পরিপ্রেক্ষিত
ইতিহাস বিশ্লেষকরা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবির্ভাব কালকে ‘আইয়ামে জাহিলিয়াত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সন্দেহ নেই, সেই যুগের জন্য এই আখ্যাটিই যথার্থ।
সেই যুগটি ছিলো মানব সমাজ ও সভ্যতার অতি অধপতিত একটি অধ্যায়।
দেশে দেশে তখন রাজা আর সম্রাটদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। তারা মানুষের প্রভু সেজে বসেছিলো। তাদের খেয়াল-খুশিই ছিলো আইন। আইনের শাসন বলতে যা বুঝায় তখন তা ছিলো এক কল্পনাতীত বিষয়।
রাজা বা সম্রাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছিলো একটি অভিজাত শ্রেণী। তাদের আর জনগণের মাঝে ছিলো দুস্তর ব্যবধান। তারা জনসাধারণকে ঘৃণার চোখে দেখতো। কিন্তু তাদের বিলাসী জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ঐ সাধারণ মানুষগুলো থেকেই আদায় করা হতো।
হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া রাজা বা সম্রাট এবং তাদের অনুগ্রহভাজন অভিজাত গোষ্ঠী ছিলো মদখোর। মদ খেয়ে মাতলামী করা আর নিত্য নতুন নারী দেহ ভোগ করা ছিলো তাদের জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাদের মনোরঞ্জনের জন্যই বিপুল সংখ্যক নারীকে হতে হয়েছে বেহায়া এবং উলংগ কিংবা অর্ধ-উলংগ।
সেই যুগে মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিলো অসহনীয়। সেটি ছিলো সুদখোরদের স্বর্ণ যুগ। কিছু সংখ্যক পুঁজিপতি সুদের মাধ্যমে অগণিত মানুষের কাছ থেকে টাকা ছেঁকে নিয়ে গড়তো টাকার পাহাড়। পুঁজিপতিরা হতো ‘আংগুল ফুলে কলাগাছ’। ঋণ গ্রহীতারা হতো কংকালসার।
সেই যুগে পৃথিবীর সকল দেশেই গরু, ছাগল, উট, ভেড়ার মতো মানুষ বেচা-কেনার জন্যও হাট বসতো। এক বিত্তবান ব্যক্তির কাছ থেকে আরেক বিত্তবান ব্যক্তি কিনে নিতো দাস-দাসী। এরা রাতভর-দিনভর শ্রম দিতো মনিবের বাড়িতে, বাগানে, খামারে কিংবা কারখানায়। এই দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় ছিলো মৃত্যু।
সেই যুগে নারীদের দুর্ভোগের অন্ত ছিলো না। নারীদের একমাত্র কর্তব্য ছিলো পুরুষদের যৌন ক্ষুধা মেটাতে থাকা। একজন পুরুষ যতো সংখ্যক ইচ্ছা বিয়ে করতে পারতো। আবার বিত্তবান হলে রক্ষিতা হিসাবে রাখতে পারতো অসংখ্য নারী। কোন কোন অঞ্চলে পিতার মৃত্যুর পর পুত্ররা তাদের সৎ-মা’দেরকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতো। কোন কোন অঞ্চলে কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তাকে মেরে অথবা জীবিতাবস্থায় গর্তে ফেলে মাটি চাপা দেয়া হতো।
রাজা বা সম্রাটরা ওঁত পেতে থাকতো পররাজ্য আক্রমণের জন্য। পররাজ্য দখল করে সেখানে তারা তাদের প্রভুত্ব চাপিয়ে দিতো, দুই হাতে লুটে নিতো দখলকৃত দেশের সম্পদ, যুবকদেরকে করতো হত্যা, আর যুবতীদেরকে ধরে নিয়ে যেতো তাদের যৌবন রস আস্বাদনের জন্য।
সেই যুগে সামগ্রিকভাবে মানুষের জান, মাল ও ইয্যাতের কোন নিরাপত্তা ছিলো না। চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি ইত্যাদি ছিলো নিত্য-দিনের ঘটনা।
তদুপরি এটি ছিলো চরম ধর্মীয় বিকৃতির যুগ। মাক্কায় অবস্থিত তাওহীদের কেন্দ্র কা‘বায় স্থাপিত হয়েছিলো ৩৬০টি দেব-দেবীর মূর্তি। মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য এদের কাছে প্রার্থনা করা হতো। এদের উদ্দেশ্যে উট, ভেড়া, বকরি বলি দেওয়া হতো।
আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত যিয়ারাতকারীরা উলংগ হয়ে কা‘বার তাওয়াফ করতো। আরবের মুশরিকদের ছালাত সম্পর্কে সূরা আল আনফালের ৩৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
وَمَا كَانَ صَلاَتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ إِلاَّ مُكَاء وَتَصْدِيَةً০
‘তাদের ছালাত ছিলো বাইতুল্লাহর কাছে শিস দেওয়া আর হাত তালি দেওয়া।’
আরবের পূর্ব দিকে ছিলো ইরান সাম্রাজ্য। কল্পিত দেবতা আহুর মাজদা ছিলো ইরানীদের সবচে’ বড়ো উপাস্য। তাদের ধারণায় আহুর মাজদা-র প্রকাশ ঘটতো আগুনের শিখার মাঝে। তাই পুরোহিত কর্তৃক প্রজ্জলিত আগুনের অনির্বাণ শিখার উদ্দেশ্যে তারা সাজদা করতো।
আরবের উত্তরে ছিলো বিশাল রোমান সামাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যে তখন সেন্ট পল কর্তৃক উদ্ভাবিত খৃস্টবাদের বেশ প্রসার ঘটে। সেন্ট পল ছিলেন ত্রিত্ববাদের প্রবক্তা। তাঁর প্রচারিত ধর্মমত মারইয়াম (রা) এবং ঈসা ইবনু মারইয়ামকেও (আলাইহিস সালাম) খৃস্টানদের উপাস্যে পরিণত করে।
কালক্রমে খৃস্টানগণ দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি ভাগ বৈরাগ্যবাদকে তাদের জীবনাদর্শ বানিয়ে নেয়। অপর ভাগটি ভোগবাদী হয়ে পড়ে। বৈরাগ্যবাদী খৃস্টানগণ গোসল না করা, ছেঁড়া-ময়লা পোশাক পরা, গোশত-রুটি না খাওয়া ইত্যাদিকে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতো। পক্ষান্তরে, ভোগবাদী খৃস্টানগণ ভুরিভোজ, মদপান ও অবাধ যৌনাচারে মত্ত হয়ে পড়ে। তাদের মদের আসরে উর্ধ্ব-উলংগ নর্তকীরা নাচতো ও গান গাইতো। সুগন্ধি দ্রব্য জ্বালিয়ে গোটা পরিবেশকে উত্তেজক করে তোলা হতো।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইয়াহুদীরা নিজেদেরকে মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম)-এর অনুসারী বলে দাবি করতো। প্রকৃতপক্ষে তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি নাযিলকৃত আত্ তাওরাতের অনুসারী ছিলো না। বরং তারা আত্ তাওরাতকে বিকৃত করে ফেলেছিলো এবং বহু হারামকে হালাল বানিয়ে নিয়েছিলো। মুজাদ্দিদ উযাইরকে (রাহ) তারা আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করতো।
সামগ্রিকভাবে তখন গোটা পৃথিবী ছিলো জাহিলিয়াতের পদানত।
সেই যুগে দুই চারজন বিবেকবান ব্যক্তি যে ছিলেন না, তা নয়। কিন্তু তাঁরা ছিলেন অসহায়। তদুপরি অধপতিত সমাজ ব্যবস্থাকে ভেংগে নতুন সমাজ বিনির্মাণের কোন নীতিমালা ও কলা-কৌশল তাঁদের জানা ছিলো না।
এই মহা দুর্দিনে পৃথিবীবাসীকে মুক্তির পথ বাতলাবার জন্য আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটান। তিনিই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাক্কা শহরেই জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্ধিত হন। তিনি যখন ১৭ বছরের তরুণ, তখন তাঁর চাচা আযযুবাইর ইবনু আবদিল মুত্তালিব কিছু বিবেকবান ব্যক্তিকে নিয়ে একটি মিটিং করেন। আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের ঘরে অনুষ্ঠিত হয় সেই মিটিং। বানু হাশিম, বানু জুহরাহ, বানু তাইম এর বেশ কিছু সদস্য এতে উপস্থিত ছিলেন। আলাপ-আলোচনার পর তাঁরা একটি সংস্থা গঠন করেন। এই সংস্থার নাম রাখা হয় হিলফুল ফুদুল। এর পাঁচ দফা কর্মসূচি ছিলো নিম্নরূপÑ
 আমরা দেশ থেকে অশান্তি দূর করবো।
 আমরা মুসাফিরদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো।
 আমরা অভাবীদেরকে সাহায্য করবো।
 আমরা মাযলুমের সাহায্য করবো।
 আমরা কোন যালিম ব্যক্তিকে মাক্কায় আশ্রয় দেবো না।
তরুণ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারুণ উৎসাহ নিয়ে এই সংস্থার সদস্য হন এবং সমাজে একটি কল্যাণ ধারা সৃষ্টির প্রয়াসে নিয়োজিত থাকেন। ২৩ বছর ধরে চলে এই প্রয়াস। দেখা গেলো ২৩ বছর আগে সমাজ যেই তিমিরে ছিলো ২৩ বছর পর সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।
প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাবুক প্রকৃতির হয়ে ওঠেন। তিনি নির্জনতা পছন্দ করতে শুরু করেন। এই সময়টি সম্পর্কে আয়িশা আছ ছিদ্দিকা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘আল্লাহ যখন রাসূলুল্লাহকে সম্মানিত এবং মানব জাতিকে তাঁর দ্বারা অনুগৃহীত করতে চাইলেন তখন রাসূলুল্লাহ নবুওয়াতের অংশ হিসেবে স্বপ্ন দেখতে থাকেন যা সূর্যোদয়ের মতো সত্য হতো। এই সময় আল্লাহ তাঁকে নির্জনে অবস্থানের প্রতি আগ্রহী করে দেন। নির্জনতা তাঁর প্রিয় ওঠে।’
এই নির্জনতা প্রীতি ও নিভৃত অবস্থানেরই নাম ‘তাহান্নুস’।
নিভৃতে একাকীত্বে আল্লাহর ইবাদাত করার জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেছে নেন জাবালুন্ নূরের হেরা গুহাটি। তিনি কয়েক দিনের খাদ্য ও পানীয় নিয়ে হেরা গুহায় চলে যেতেন। খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে গেলে গুহা থেকে নেমে ঘরে এসে আবার কয়েক দিনের খাদ্য ও পানীয় নিয়ে চলে যেতেন।
উল্লেখ্য, জাবালুন্ নূর কা‘বা থেকে প্রায় চার মাইল দূরে অবস্থিত। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে হেরা গুহা পর্যন্ত উঠতে ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে গুহা পর্যন্ত পৌঁছা সহজ কাজ নয়। নিভৃতে আল্লাহর ইবাদাতে কাটাবার জন্য তিনি এই গুহাটিকেই বেছে নেন।
এই অবস্থাতেই একদিন আল্লাহর দূত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) হেরা গুহায় এসে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
‘পড়–ন।’ তিনি বললেন, ‘আমি পড়তে পারি না।’ জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিয়ে বলেন, ‘পড়–ন।’ তিনি বললেন, ‘আমি পড়তে পারি না।’ জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) ‘তাঁকে আবার বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিয়ে বলেন, ‘পড়–ন।’ তিনি বললেন, ‘আমি পড়তে পারি না।’
তৃতীয়বার তাঁকে বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিয়ে জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) বলেন,
اِقْرَأ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِىْ خَلَقَ০ خَلَقَ الاِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ০ اِقْرَأ وَرَبُّكَ الاَكْرَمُ ০ الَّذِىْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ০ عَلَّمَ الاِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ০
‘পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ থেকে। পড় এবং তোমার রব বড়োই অনুগ্রহশীল। যিনি কলম দ্বারা জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।’
এবার মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিবরাঈল (আলাইহিস সাল্লাম)-এর সাথে আয়াত গুলো উচ্চারণ করলেন এবং এই গুলো তাঁর অন্তরে গেঁথে গেলো।
অতপর জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) চলে যান। ভীত কম্পিত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হেরা গুহা থেকে নেমে ঘরে ফেরেন এবং স্ত্রী খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদকে (রা) ডেকে বলেন, ‘যাম্মিলুনী যাম্মিলুনী।’ (আমাকে কম্বল জড়িয়ে দাও, আমাকে কম্বল জড়িয়ে দাও)।
ভীতি ভাব কেটে গেলে তিনি বললেন, “খাদীজা, আমার কী হয়ে গেলো। আমার তো জীবনের ভয় ধরে গেছে।” খাদীজা (রা) বললেন, “আপনি আশ্বস্ত হোন। আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয় স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করেন, সত্য কথা বলেন, আমানাতের হিফাযাত করেন, অসহায় লোকদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, নিজে উপার্জন করে অভাবীদেরকে দান করেন। আতিথ্য রক্ষা করেন এবং ভালো কাজে সহযোগিতা করেন।”
সূরা আল ‘আলাকের এই পাঁচটি আয়াত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি নাযিলকৃত প্রথম ওহী।
ঈসায়ী ৬১০ সনের রমাদান মাসে এই আয়াত গুলো নাযিল হয়। এই আয়াতগুলোতে সৃষ্টি জগতের মহান স্রষ্টা আল্লাহ কেন্দ্রিক জ্ঞান চর্চার আহ্বান জানানো হয়েছে। মাতৃগর্ভে সন্তানের উন্মেষ হওয়ার প্রথম কয়েকটি দিন জরায়ু গাত্রে ঝুলে থাকা অতি ছোট্ট একটি রক্ত পিণ্ড থেকে যে মানুষের যাত্রা শুরু, সেই জ্ঞান তাঁকে দেওয়া হয়েছে। তদুপরি নগণ্য অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে মানুষ যে অসামান্য অবস্থায় উন্নীত হয়, সেই সম্পর্কেও তাঁকে অবহিত করা হয়েছে।
এই আয়াত কয়টিতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে নবী বানানো হয়েছে সেই ধারণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নবী হিসেবে তাঁর করণীয় কী তা এই আয়াতগুলোতে বলা হয়নি।
প্রথম ওহী নাযিলের পর কেটে যায় কয়েকটি মাস। এই দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন মাক্কার একটি পথ ধরে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ওপর থেকে একটি আওয়াজ ভেসে আসে। উপরের দিকে তাকিয়ে তিনি জিবরাঈলকে (আলাইহিস সালাম) দেখতে পান এবং দ্রুত কদমে ঘরে ফিরে স্ত্রীকে বলেন, “যাম্মিলুনী যাম্মিলুনী।”
গায়ে কম্বল জড়িয়ে তিনি শুয়ে পড়েন। কিন্তু জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁর সংগ ছাড়লেন না। তিনি সূরা আল মুদ্দাসসিরের এই সাতটি আয়াত আবৃত্তি করলেন। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আয়াত গুলো পড়লেন এবং এই গুলো তাঁর অন্তরে গেঁথে গেলো।
৪। ব্যাখ্যা
 ياَيَّهَا الْمُدَّثِّرُ.
এটি এই সূরার প্রথম আয়াত। এই আয়াতের ‘মুদ্দাসসির’ শব্দটি নিয়ে এই সূরার নাম করণ করা হয়েছে।
এই আয়াতের অর্থ হচ্ছে ‘ওহে আবৃত ব্যক্তি’ অথবা ‘ওহে বস্ত্রাচ্ছাদিত ব্যক্তি।’
এটি একটি প্রীতিপূর্ণ সম্বোধন।
আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ কিংবা ‘ইয়া আইউহান্নাবীউ’ বলেও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্বোধন করতে পারতেন। তা না করে তিনি এই প্রীতিপূর্ণ সম্বোধন ব্যবহার করাটাই পছন্দ করেছেন।
 قُمْ فَاَنْذِرْ.
এটি এই সূরার দ্বিতীয় আয়াত। এর অর্থ ‘ওঠ, এবং (লোকদেরকে) সাবধান কর।’
এই আয়াতের মাধ্যমে নবী হিসেবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যতম কর্তব্য নির্দেশ করা হয়েছে।
قُمْ শব্দের অর্থ ‘ওঠ’। আবার এর অর্থ হয় ‘দাঁড়াও’, ‘কর্তব্য কর্মে নেমে পড়’।
فَاَنْذِرْ অর্থ ‘লোকদেরকে সাবধান কর।’
অর্থাৎ লোকেরা স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন করে একদিকে দুনিয়ার জীবনে অশান্তি ভোগ করছে, অপর দিকে আখিরাতের অনন্ত জীবনে চিরন্তন শাস্তি ভোগ করা সুনিশ্চিত করছে। অতএব এই বিষয়ে তুমি তাদেরকে সতর্ক কর। তাদেরকে স্বেচ্ছাচারিতা পরিহার করতে বল।
 وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ .
অর্থ ‘এবং তোমার রবের বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর, প্রতিষ্ঠা কর।’
এটি এই সূরার তৃতীয় আয়াত। এই আয়াতটি অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ। ছোট্ট দুইটি শব্দের মাধ্যমে নবী হিসেবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রধান কর্তব্য কী তা তাঁকে বলে দেওয়া হয়েছে। আর সেই সুমহান কর্তব্যটি হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা ও প্রতিষ্ঠা করা।
মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ। মহাবিশ্ব আল্লাহর বিধান মেনে চলে আল্লাহরই বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি প্রদান করছে। মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ। মানুষের কর্তব্য আল্লাহর বিধানগুলো মেনে চলে আল্লাহর বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি প্রদান করা।
কিন্তু মানুষ নবী-রাসূলদের প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অপর কোন মানুষ কিংবা অপর কোন সৃষ্টিকে বড়ো কিংবা শ্রেষ্ঠ মনে করে তার বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। এটি মানুষের জন্য সমীচীনও নয়, শোভনীয়ও নয়।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবির্ভাবকালে সামগ্রিকভাবে গোটা মানবগোষ্ঠী এই অসমীচীন ও অশোভনীয় কাজটিই করছিলো। এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন নির্দেশ দিলেন, ‘ওয়া রাব্বাকা ফা-কাব্বির’ (তোমার রবের বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর, প্রতিষ্ঠা কর)। উল্লেখ্য যে বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব শব্দটির সমভাব প্রকাশক আরেকটি শব্দ হচ্ছে সার্বভৌমত্ব। এই ছোট্ট আয়াতটি দ্বারা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আদায় করে তাঁরই প্রতি আনুগত্যশীল জীবন যাপনের জন্য মানবগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালাবার জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দেওয়া হয়।
وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ. 
অর্থ ‘এবং তোমার পোশাক পবিত্র-পরিচ্ছন্ন রাখ।’
এটি এই সূরার চতুর্থ আয়াত।
طَهِّرْ শব্দটি ‘তুহরুন’ বা ‘তাহারাত’ শব্দ থেকে উৎসারিত। ‘তুহরুন’ বা ‘তাহারাত’ শব্দটি যুগপৎ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্থ প্রকাশ করে।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বভাবগত ভাবেই পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন। তিনি যেন সচেতনভাবে এবং কর্তব্য মনে করে তাঁর পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখেন তারই শিক্ষা রয়েছে এই আয়াতে।
নৈতিক দিক দিয়ে পোশাক পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার অর্থ হচ্ছে, পোশাক এমন হতে হবে যাতে অহংকার প্রকাশ পাবে না, তাতে কুরুচির ছাপও থাকবে না। উল্লেখ্য যে এই আয়াতের শিক্ষা পরিধেয় বস্ত্র পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। মুমিনদের বিছানার চাদর, বালিসের কাভার, দরওয়াজা-জানালার পর্দা, আসবাব পত্র, গৃহের অভ্যন্তর এবং বহিরাংগন পরিচ্ছন্ন রাখাও এই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
اِنَّ اللهَ نَظِيْفٌ يُحِبُّ النَّظَافَةَ....فَنَظِّفُوْا اَفْنِيَتَكُمْ.
[ছালিই ইবনু আবি হাসসান (রহ), জামে আত তিরমিযী, হাদীস নাম্বার-২৭৩৬]
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা ভালো বাসেন।... অতএব তোমরা তোমাদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখ।”
وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ.
অর্থ ‘এবং যাবতীয় মলিনতা থেকে দূরে থাক।’
এটি এই সূরার পঞ্চম আয়াত। এটিও একটি ব্যাপক অর্থবোধক আয়াত।
চিন্তা-চেতনায়, আচার-আচরণে এবং যাবতীয় কর্মকাণ্ডে জাহিলিয়াতের মলিনতার সামান্যতম ছোঁয়াও যেন লাগতে না পারে সেই জন্য অতন্দ্র প্রহরীর মতো সতর্ক থাকার জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
وَلاَ تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ.
অর্থ ‘এবং বেশি পাবে আশায় অনুগ্রহ করো না।’
এটি এই সূরার ষষ্ঠ আয়াত। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আদায়ের প্রয়াসে নিয়োজিত ব্যক্তির জন্য এটি আবশ্যিকভাবে অনুসরণীয় একটি নীতি।
মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া, মানুষকে স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন করা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল জীবন যাপনের দিকে টেনে আনা, মানুষের প্রতি অতি বড়ো অনুগ্রহ।
এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, এই বিরাট অনুগ্রহের কাজটি করতে হবে শুধু আল্লাহর জন্য, অন্য কারো কাছ থেকে কোন রূপ বিনিময় পাওয়ার জন্য নয়। পরিপূর্ণ নিঃস্বার্থতাসহকারে এই কাজ করতে হবে, কোনরূপ বৈষয়িক স্বার্থ-সুবিধা লাভের আশা মনে পোষণ করা যাবে না।
এই শিক্ষা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন অন্য সব নবী-রাসূলকেও দিয়েছিলেন। তাই তো আমরা তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে শুনি,
وَمَآ اَسْئَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ اَجْرٍ ج اِنْ اَجْرِىَ اِلاَّ عَلى رَبِّ الْعلَمِيْنَ .
‘আমি তো তোমাদের কাছে এই কাজের কোন বিনিময় চাচ্ছি না। আমার বিনিময় তো রয়েছে রাব্বুল ‘আলামীনের নিকট।’
নূহ (আলাইহিস সালাম) কুর্দিস্তান-এর অধিবাসীদেরকে (আশ্ শূ‘আরা, ১০৯),
হূদ (আলাইহিস সালাম) ‘আদ জাতিকে (আশ্ শূ‘আরা, ১২৭),
ছালিহ (আলাইহিস সালাম) ছামুদ জাতিকে (আশ্ শূ‘আরা, ১৪৫),
লূত (আলাইহিস সালাম) ট্রান্সজর্ডনের অধিবাসীদেরকে (আশ্ শূ‘আরা, ১৪৬),
এবং শু‘আইব (আলাইহিস সালাম) মাদ্ইয়ানবাসীদেরকে (আশ্ শূ‘আরা, ‌১৮০),
সম্বোধন করে এ কথাই বলেছিলেন।
وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ.
এটি এই সূরার সপ্তম আয়াত। এটিও একটি তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবেমাত্র নবুওয়াতের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করা হলো। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেওয়ার ডাক তিনি এখনো দেননি। ফলে ময়দানে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এখনো দেখা যায়নি। তথাপিও আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অগ্রিম জানিয়ে দিলেন যে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য-পালন করতে গেলে তাঁকে বাধা-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে। চলার পথের বাঁকে বাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে হবে। বাধা যতোই কঠিন হোক না কেন, পরিস্থিতি যতোই ভীতিপ্রদ হোক না কেন তাঁকে কর্তব্য কর্মে দৃঢ়পদ থাকতে হবে।
৫। শিক্ষা
 মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুসরণে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব তথা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদেরকে নিবেদিত হতে হবে।
 আমাদের পোশাক হতে হবে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন, রুচিশীল এবং গর্ব অহংকারের ছাপমুক্ত। আমাদের গৃহাংগন ও গৃহের পার্শ্বস্থ অংগনও হতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
 আমাদের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ এবং যাবতীয় কর্মকাণ্ড হতে হবে জাহিলিয়াতের মলিনতার ছোঁয়া মুক্ত।
 আমাদেরকে আল্লাহর বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে, কোনরূপ বৈষয়িক স্বার্থ সুবিধা লাভের আশা থেকে মনকে সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত রেখে।
 আমাদেরকে বিরোধিতা, বাধা-বিপত্তি এবং কঠিন পরিস্থিতির মুকাবিলায় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ছবর অবলম্বন করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট